সংস্কৃত এবং হিব্রু বেদের সমধর্মিতা: কেন?

সংস্কৃত বেদে মনুর বিবরণ এবং হিব্রু বেদে নোহের বিবরণের মধ্যে মিলগুলো আমরা দেখেছি I বন্যার বিবরণের তুলনায় এই মিল আরও গভীরে প্রবেশ  করে I এছাড়াও সময়ের ঊষাকালে পুরুসার বলিদানের প্রতিশ্রুতি এবং হিব্রু আদিপুস্তকের সেই প্রদত্ত বংশধরের প্রতিশ্রুতির মধ্যে একই মিল রয়েছে I অতএব কেন আমরা এই সাদৃশ্যগুলো দেখি? সমধর্মিতা? একটি বিবরণ কি অন্য বিবরণের থেকে ধার করেছে বা চুরি করেছে? এখানে একটি পরামর্শ দেওয়া হ’ল I     

বাবিলের মিনার – বন্যার পরে

নোহের বিবরণের পরে, বেদা পুস্তকম (বাইবেল) তার তিন পুত্রদের বংশধর  এবং রাজ্যগুলোর নথিভুক্ত করতে অগ্রসর হয় I “বন্যার পরে এদের থেকে  জাতিগুলো সমস্ত পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে পড়ল I” (আদিপুস্তক 10:32) I সংস্কৃত বেদও ঘোষণা করে যে মনুর তিন পুত্র ছিল যাদের থেকে সমস্ত মানব জাতির অবতরণ হ’ল I কিন্তু এই “ছড়িয়ে পড়া” কিভাবে ঘটল?    

প্রাচীন হিব্রু বেদা নোহের এই তিন পুত্রদের বংশধরগুলোর নাম তালিকাভুক্ত করেছে – সম্পূর্ণ তালিকাটি এখানে I বিবরণটি বর্ণনা করতে এগিয়ে যায় কিভাবে এই বংশধরগুলো ঈশ্বরের (প্রজাপতি) – সৃষ্টিকর্তার নির্দেশগুলোর অবমাননা করলো, যিনি তাদেরকে ‘পৃথিবী পরিপূর্ণ করতে’ আজ্ঞা দিয়েছিলেন I আপনি সেটিকে এখানে পড়তে পারেন I এই মিনার ‘আকাশ পর্যন্ত পৌঁছল’ (আদিপুস্তক 11:4) যার মানে হ’ল নোহের এই বংশধরেরা সৃষ্টিকর্তার পরিবর্তে নক্ষত্র এবং সূর্য, চাঁদ, গ্রহ সমূহ ইত্যাদির আরাধনা করার উদ্দেশ্যে মিনার তৈরী করছিল I এটি সুপরিচিত যে নক্ষত্রর আরাধনা মেসোপটোমিয়ার মধ্যে উৎপত্তি হয়েছিল (যেখানে এই বংশধররা বসবাস করছিল) এবং তাতে এটা তখন সমস্ত পৃথিবী জুড়ে ছড়াল I      

অতএব সৃষ্টিকর্তার আরাধনা করার পরিবর্তে, আমাদের পূর্বপুরুষরা নক্ষত্র সমূহের আরাধনা করত I পরে বিবরণটি বলে যে এটিকে নিরুৎসাহ করতে, যাতে আরাধনার অশুচিতা অপরিবর্তনীয় না হয়ে ওঠে, সৃষ্টিকর্তা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন    

…ভাষার ভেদ জন্মাতে যাতে তারা একজন অন্যজনের ভাষা বুঝতে না পারে I

আদিপুস্তক 11:7

এর ফলে, নোহের এই প্রথম বংশধররা একে অপরকে বুঝতে পারল না আর তাই এইভাবে সৃষ্টিকর্তা

তাদেরকে সমস্ত ভূমন্ডলে ছিন্নভিন্ন করলেন

আদিপুস্তক 11:8

একবার যখন এই লোকেরা একে অপরের সঙ্গে আর কথা বলতে পারল না, তারা একে অপরের থেকে দেশান্তরে গেল, তাদের নবনির্মিত ভাষাসংক্রান্ত  গোষ্ঠীদের মধ্যে, এবং এইরূপে তারা ‘বিচ্ছিন্ন’ হয়ে গেল I এটি ব্যাখ্যা করে কেন বিভিন্ন লোকেদের গোষ্ঠী আজকের সময়ে পৃথিবীতে একেবারে বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে, যেমনভাবে প্রতিটি গোষ্ঠী মেসোপটোমিয়ার, (অনেক প্রজন্মব্যাপী সময়ে সময়ে) তাদের মূল কেন্দ্র থেকে স্থানগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছিল যাদেরকে আজ আমরা দেখতে পাই I এইরূপে, তাদের নিজ নিজ ইতিহাসগুলো এই বিন্দু থেকে নানান দিকে ছড়িয়ে পড়ে I কিন্তু প্রতিটি ভাষার গোষ্ঠীর (যা এই প্রথম জাতিগুলোকে গঠন করেছিল) এই বিন্দু পর্যন্ত এক সাধারণ ইতিহাস ছিল I এই সাধারণ ইতিহাস পুরুসার বলিদানের মাধ্যমে মোক্ষের প্রতিশ্রুতি এবং মনুর (নোহ) বন্যার বিবরণকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল I সংস্কৃতের ঋষিগণ এই ঘটনাগুলোকে তাদের বেদের মাধ্যমে মনে রেখেছিল এবং হিব্রুরা এই একই ঘটনাগুলোকে তাদের বেদের (ভাববাদী মশির তোরাহ) মাধ্যমে মনে রেখেছিল I  

বিচিত্র বন্যার স্বাক্ষ্য – পৃথিবীর চারিদিক থেকে

আগ্রহের বিষয় হ’ল, বন্যার বিবরণ কেবলমাত্র প্রাচীন হিব্রু এবং সংস্কৃত বেদের মধ্যে স্মরণ করা হয় নি I বিশ্বের চারিদিকের নানাবিধ লোকেদের গোষ্ঠী তাদের নিজ নিজ ইতিহাসে এক বিশাল বন্যাকে মনে রেখেছে I নিম্নলিখিত বর্ণনাচিত্র এটিকে বর্ণনা করে I 

Flood accounts from cultures around the world compared to the flood account in the Bible

বাইবেলের বন্যার বিবরণের সঙ্গে পৃথিবী ব্যাপী সংস্কৃতি সমূহের বন্যার তুলনামূলক বিবরণ

এটি শীর্ষ জুড়ে পৃথিবীর চতুর্দিকে বসবাসকারী বিভিন্ন ভাষা সম্প্রদায়ের লোকেদের দেখায় – প্রত্যেকটি মহাদেশে I বর্ণনাচিত্রের কোশিকাগুলো চিহ্নিত করে হিব্রু বন্যার (বর্ণনাচিত্রের বাঁ দিকে তালিকাভুক্ত) বিবরণের নির্দিষ্ট তথ্য  তাদের নিজস্ব বন্যার বিবরণকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে কি না I কালো কোশিকাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে এই তথ্য তাদের বন্যার বিবরণের মধ্যে আছে, যখন খালি কোশিকাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে এই তথ্য তাদের স্থানীয় বিবরণের মধ্যে নেই I আপনি এখতে পারেন যে প্রায় সমস্ত এই গোষ্ঠীগুলোর কাছে কমপক্ষে  সাধারণভাবে ‘স্মৃতি’ ছিল যে বন্যাটি সৃষ্টিকর্তার ন্যায়বিচার ছিল তবে কিছু লোকেদের একটি বিরাট জাহাজের মধ্যে রক্ষা করা হয়েছিল I অন্য কথায়, এই বন্যার স্মৃতি না কেবল সংস্কৃত এবং হিব্রু বেদগুলোতে, বরং এছাড়া পৃথিবীর চতুর্দিকের সাংস্কৃতিক ইতিহাস এবং মহাদশগুলোর মধ্যেও পাওয়া গিয়েছিল I এটি আমাদের সুদূর অতীতে ঘটা এই ঘটনার দিকে নির্দেশ করে I 

হিন্দি ক্যালেন্ডারের স্বাক্ষ্য

hindu-calendar-panchang

হিন্দি ক্যালেন্ডার – মাসের দিনগুলো শীর্ষ থেকে নীচু অবধি যায়, কিন্তু সাত-দিনের সপ্তাহ আছে 

পাশ্চাত্য ক্যালেন্ডারের সঙ্গে হিন্দি ক্যালেন্ডারের পার্থক্য এবং মিল অনুরূপভাবে সুদূর অতীতের এই ভাগ করা স্মৃতির স্বাক্ষ্য হয় I বেশিরভাগ হিন্দি ক্যালেন্ডার  গঠন করা হয় যা এদিক থেকে ওদিকের সারির পরিবর্তে (বাঁ থেকে ডান দিকে) নিচের কলমে (উপর থেকে নীচে) যায়, যেটি পাশ্চাত্য ক্যালেন্ডারের জন্য সার্বজনীন গঠন I ভারতের কিছু হিন্দু ক্যালেন্ডার সংখ্যার জন্য হিন্দি লিপি ব্যবহার করে  (१, २,  ३ …), এবং কিছু পাশ্চাত্য সংখ্যা (1, 2, 3…) ব্যবহার করে I এই পার্থক্যগুলো আশানুরূপ যেহেতু একটি ক্যালেন্ডারকে চিহ্নিত করার জন্য কোনো ‘সঠিক’ পদ্ধতি নেই I কিন্তু সমস্ত ক্যালেন্ডারগুলোর মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় সাদৃশ্য আছে I পাশ্চাত্য জগতের মতন – হিন্দি ক্যালেন্ডার 7-দিনের সপ্তাহ ব্যবহার করে I কেন? আমরা বুঝতে পারি পাশ্চাত্য একটির মতন কেন ক্যালেন্ডারকে বছর এবং মাসে বিভক্ত করা হয়েছিল যেহেতু এগুলো পৃথিবীর চারপাশে থাকা সূর্য এবং চাঁদের চারিপাশে পৃথিবীর প্রদক্ষিণের উপরে ভিত্তিশীল হয় – এইরূপে সাধারণত সমস্ত লোকেদের কাছে গ্রহবিজ্ঞান সংক্রান্ত ভিত্তিগুলো দেয় I কিন্তু সাত-দিনের সপ্তাহের জন্য গ্রহবিজ্ঞান সংক্রান্ত কোনো ভিত্তি নেই I এটি প্রথা এবং পরম্পরা থেকে আসে যা ইতিহাসের সুদুর অতীতে গমন করে I (কেউ বোধ হয় জানে না কতটা পেছনে যায়) I          

… এবং বৌদ্ধধর্মালম্বী থাই ক্যালেন্ডার

thai_lunar_calendar

থাই ক্যালেন্ডার বাঁ থেকে ডান দিকে যায়, কিন্তু পশ্চিমের তুলনায় একটি ভিন্ন বছর আছে – কিন্তু তবুও 7-দিনের সপ্তাহ 

বৌদ্ধ ধর্মালম্বী দেশ হয়ে, থাইরা বুদ্ধের জীবন থেকে তাদের বছরগুলো চিহ্নিত করে যাতে তাদের বছরগুলো সর্বদা পশ্চিমের তুলনায় 543 বছর অধিক হয় (অর্থাৎ খ্রীষ্টপুর্বাব্দ 2019 বৌদ্ধ যুগের মধ্যে 2562 হয় – থাই ক্যালেন্ডারের মধ্যে) I কিন্তু পুনরায় তারা একটি 7-দিনের সপ্তাহ ব্যবহার করে I কোথা থেকে তারা সেটি পেল? বিভিন্ন দেশ জুড়ে 7-দিনের সপ্তাহের উপরে ভিত্তিশীল ক্যালেন্ডারগুলো এত ভিন্ন উপায়ে আলাদা কেন যখন এই সময় ইউনিটের জন্য কোনো প্রকৃত গ্রহবিজ্ঞান সংক্রান্ত ভিত্তি নেই?  

সপ্তাহের উপরে প্রাচীন গ্রীকের স্বাক্ষ্য

প্রাচীন গ্রীকরাও তাদের ক্যালেন্ডারের মধ্যে 7-দিনের সপ্তাহ ব্যবহার করত I 

প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসাবিদ হিপ্পোক্রেটস, যিনি প্রায় 400 খ্রীষ্টপূর্বাব্দের পাশাপাশি বাস করতেন আধুনিক চিকিৎসার জনক বিবেচনা করা হয় এবং তিনি বই লিখলেন, আজ অবধি সংরক্ষিত আছে, তার চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ক পর্যবেক্ষণগুলো নথিভুক্ত করে I এই রকম করার সময়ে তিনি একটি সময় ইউনিট হিসাবে ‘সপ্তাহ’ কে ব্যবহার করতেন I কোনো রোগের ক্রমবর্ধমান লক্ষণগুলো সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে তিনি ব্যক্ত করলেন:      

চতুর্থ দিবস হ’ল সপ্তম দিবসের সূচক; অষ্টম হ’ল দ্বিতীয় সপ্তাহের  সূত্রপাত; আর অত:পর, একাদশতম দ্বিতীয় সপ্তাহের চতুর্থ হয়ে সূচকও  হয়; আর পুনরায়, সপ্তদশতম সূচক হয়, যেমন চতুর্দশতম থেকে চতুর্থ, এবং একাদশতম থেকে সপ্তম হয়   

হিপ্পোক্রেটস, এফোরিসম্স I #24

350 খ্রীষ্টপূর্বাব্দে, এরিস্টটল নিয়মিতরূপে সময়ের সীমানির্দেশ করতে লেখার সময়ে ‘সপ্তাহ’ কে ব্যবহার করেন I একটি উদাহরণ দিতে তিনি লেখেন:

বেশিরভাগ শিশু মৃত্যু শিশুর এক সপ্তাহ বয়সের পূর্বে ঘটে I অত:পর সেই বয়সে শিশুর নামকরণ প্রথাগত, একটি বিশ্বাস থেকে যে এর বেঁচে থাকার এখন ভাল সুযোগ আছে I   

এরিস্টটল, দি হিস্ট্রি অফ এনিমালস, খন্ড 12, প্রায় 350 খ্রীষ্টপূর্বাব্দ

তাই ভারত এবং থাই দেশের থেকে অনেক দূরে থাকা, এই প্রাচীন গ্রীক  লেখকরা ‘সপ্তাহের’ ধারণা কোথায় পেল যেন তারা এই আশা করে ব্যবহার করত যে তাদের গ্রীক পাঠকরা জানত যে একটি ‘সপ্তাহ’ কি ছিল? হয়ত সেখানে এটি ঐতিহাসিক ঘটনা তাদের অতীতে এই সমস্ত সংস্কৃতিগুলোর মধ্যে ঘটেছিল (যদিও তারা ঘটনাটি ভুলে গিয়ে থাকবে) যা 7-দিনের সপ্তাহকে স্থাপিত করেছিল?

ঠিক এইরকম একটি ঘটনাকে হিব্রু বেদা বর্ণনা করে – পৃথিবীর প্রারম্ভিক    সৃষ্টি I সেই বিস্তারিত এবং প্রাচীন বিবরণে সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীর সৃষ্টি করেন এবং 7 দিনে (বিশ্রামের সপ্তম দিন সহ 6 দিনে) প্রথম মানুষের আকার প্রদান করেন I সেই কারণে, প্রথম মানবজাতি তাদের ক্যালেন্ডারে 7-দিনের সপ্তাহের সময় ইউনিট ব্যবহার করল I মানবজাতি যখন পরবর্তীকালে ভাষার বিভ্রান্তির দ্বারা বিচ্ছিন্ন হল তখন আসন্ন বলিদানের প্রতিশ্রুতি, বিপর্যয়মূলক বন্যার বিবরণের, পাশা পাশি 7-দিনের সপ্তাহ সহ এই বৃহৎ ঘটনাগুলোকে এই বিচ্ছিনতার পূর্বে এই বিভিন্ন ভাষা গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অনেকেদের দ্বারা স্মরণ করা হয়েছিল I    

এই স্মৃতিগুলো আদি মানবজাতির জীবন্ত শিল্পকর্ম এবং এই বেদগুলোতে নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর ইতিহাসের কাছে একটি নিয়ম I এই ব্যাখ্যা হিব্রু এবং সংস্কৃতের বেদগুলোর মধ্যে অভিন্নতা ব্যাখ্যা করতে নিশ্চিতভাবে অত্যন্ত সরাসরি উপায় I কেউ কেউ এই প্রাচীন রচনাগুলোকে নেহাৎ কুসংস্কারপূর্ণ পুরাণশাস্ত্র রূপে আজকের দিনে বাতিল করে কিন্তু তাদের অভিন্নতাগুলো গুরুত্বপূর্ণভাবে সেগুলোকে  আমাদের গ্রহণ করার কারণ হয় I    

আদি মানবজাতির একটি সাধারণ ইতিহাস ছিল যা সৃষ্টিকর্তার থেকে মোক্ষের প্রতিশ্রুতিকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল I কিন্তু প্রতিশ্রুতি কিভাবে পূরণ হবে? আমরা এক পবিত্র মানুষের বর্ণনার সাথে চলতে থাকি যিনি ভাষার বিভ্রান্তির দ্বারা সৃষ্ট বিচ্ছিন্নতার ঠিক পরে বাস করতেন I আমরা এটিকে পরবর্তী পর্যায়ে ওঠাবো I  

[প্রাচীন স্মৃতিগুলোর দিকে আরও একবার দৃষ্টি দিতে যা একই ধরণের সমধর্মিতা সমূহকে দেখায় – কিন্তু এই সময়ে চীন ভাষার লিপিবিদ্যার মাধ্যমে এখানে দেখুন]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *