মোক্ষের প্রতিশ্রুতি – একদম শুরুর থেকে

আমরা দেখেছি কিভাবে তাদের সৃষ্টির প্রথম অবস্থা থেকে মানবজাতির পতন হ’ল I কিন্তু বাইবেল (বেদা পুস্তকম) একেবারে শুরুর থেকে ঈশ্বরের কাছে থাকা এক পরিকল্পনা নিয়ে ক্রমাগত অগ্রসর হতে থাকে I পূর্বে জারি করা এই পরিকল্পনা একটি প্রতিশ্রুতির উপরে কেন্দ্রীভূত এবং সেই একই পরিকল্পনা যা পুরুসাসুক্তর মধ্যে প্রতিধ্বনিত করে I

বাইবেল – সত্যিকারের এক গ্রন্থাগার

এই প্রতিশ্রুতির তাৎপর্যকে তারিফ করতে গিয়ে বাইবেল সম্পর্কে আমাদের অবশ্যই কিছু মৌলিক বিষয়গুলোকে জানা উচিৎ I যদিও এটি একটি পুস্তক, এবং আমরা এটিকে এইরকমই ভাবি, এটির সম্বন্ধে আরও সঠিক ভাবলে এটি একটি ভ্রাম্যমান গ্রন্থাগার হয় I এই কারণে এটি পুস্তক সমূহের একটি সংগ্রহ, 1500 বছর সময়ের ব্যবধানে একাধিক রচয়িতা গোষ্ঠীর দ্বারা রচিত হয়েছে I আজ এই পুস্তকগুলো একটি খন্ডের মধ্যে বাঁধা – বাইবেল I এই বিষয়টি একাই বাইবেলকে পৃথিবীর মহান পুস্তকগুলোর মধ্যে অন্যতম ঋক বেদের মতন অনন্য করেছে I নানাবিধ রচয়িতাস্বত্ব ছাড়াও, বাইবেলের পুস্তকগুলো যে সব বক্তব্য, ঘোষণা এবং ভবিষ্যদ্বানী সমূহ করেছে তাকে পরবর্তী লেখকরা অনুসরণ করে I বাইবেল যদি কেবলমাত্র একজন লেখক অথবা লেখকদের এক গোষ্ঠী দ্বারা রচিত হত যারা একে অপরকে জানত, তবে তা তাৎপর্যপূর্ণ হত না I কিন্তু বাইবেলের রচিয়তারা শত শত এবং এমনকি সহস্রাধিক বৎসর ধরে বিচ্ছিন্ন, বিভিন্ন সভ্যতা, ভাষা, সামাজিক স্তর এবং সাহিত্যিক ধারায় রচনা করেছে – তথাপি তাদের বার্তা সমূহ এবং ভবিষ্যদ্বাণীগুলো বাইবেলের বাইরের ঐতিহাসিক ঘটনা সমূহের যাচাইয়ের মাধ্যমে পরবর্তী লেখকদের দ্বারা আরও উন্নত  হয়েছে I এটি বাইবেলকে একটি সামগ্রিক ভিন্ন স্তরে অনন্য করে তোলে – এবং আমাদেরকে এর বার্তাটিকে বুঝতে অনুপ্রাণিত হওয়া উচিৎ I পুরনো নিয়মের বইয়ের বিদ্যমান হস্তলিপির প্রতিলিপিগুলো (যীশুর আগেকার  বইগুলো) যার তারিখ প্রায় 200 খ্রীষ্টপূর্বাব্দ হবে যাতে বাইবেলের পাঠগত ভিত্তি, সর্বাংশে, পৃথিবীর প্রাচীন বইগুলোর থেকে ভাল I               

বাগানের মধ্যে মোক্ষের প্রতিশ্রুতি

বাইবেলের আদিপুস্তকের ঠিক শুরুতে সৃষ্টি এবং পতনের বিবরণের পরবর্তী ঘটনা সমূহের দিকে আমরা এটিকে ‘প্রত্যাশা করতে’ দেখি I অন্য কথায়, যদিও এটি শুরুকে বর্ণনা করছে, তবুও এটিকে শেষের পরিপ্রেক্ষিতে লেখা হয়েছিল I এখানে আমরা একটি প্রতিশ্রুতিকে দেখি যখন ঈশ্বর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সর্পের স্বরূপে মন্দের ব্যক্তিত্ব শয়তানের মুখোমুখি হয়, এবং ঠিক শয়তানের দ্বারা মানবীয় পতন নিয়ে আসার পরে তার সাথে এক হেঁয়ালিতে কথা বলে I    

 “… আর আমি (ঈশ্বর) তোমাতে (শয়তান) ও নারীতে এবং তোমার বংশে ও তার বংশে শত্রুতা রাখব I সে তোমার মস্তক চূর্ণ করবে এবং তুমি তার পাদমূল চূর্ণ করবে I” 

আদিপুস্তক 3:15

সতর্কভাবে পড়লে আপনারা দেখবেন যে পাঁচটি বিভিন্ন চরিত্র উল্লিখিত আছে এবং যে এটি তার মধ্যে ভবিষ্যদ্বাণীপূর্ণ হয় যাতে এটি সময়মত প্রত্যাশা করে (‘উইল’ এর পুন: পুন: ব্যবহারের দ্বারা দেখা যায় যেন ভবিষ্যৎ কালে) I চরিত্রগুলো হ’ল     

1.ঈশ্বর/প্রজাপতি

2.শয়তান/সর্প

3. স্ত্রী

4. স্ত্রীর বংশধর

5. শয়তানের বংশধর

আর হেঁয়ালি ভবিষ্যদ্বাণী করে এই চরিত্রগুলো ভবিষ্যতে কিভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে I এটিকে নিচে দেখানো হয়েছে 

আদিপুস্তকের প্রতিশ্রুতিতে চরিত্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক সমূহ 

ঈশ্বর ব্যবস্থা করবেন যে শয়তান এবং স্ত্রীটির মধ্যে এক ‘বংশধর’ থাকবে I এই বংশধর এবং স্ত্রী ও শয়তানের মধ্যে ‘শত্রুতা বা ঘৃণা হবে I শয়তান স্ত্রীর বংশধরের ‘পাদমূল’ চূর্ণ করবে’ যেখানে স্ত্রীটির বংশধর শয়তানের মস্তক ‘চূর্ণ করবে’ I   

বংশধরের উপরে অনুমান – একটি ‘সে’

এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা পাঠ্যের থেকে কেবল সরাসরিভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি I এখন কিছু যুক্তিপূর্ণ অনুমানের জন্য I যেহেতু স্ত্রীটির ‘বংশধর’ কে একটি ‘সে’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং একটি ‘তার’ কে আমরা জানি এটি একটি একক পুরুষ মানুষ – একজন মানুষ I সেটার সাহায্যে আমরা কিছু সম্ভাব্য ব্যাখ্যা সমূহকে বাতিল করতে পারি I একটি ‘সে’ হিসাবে বংশধরটি একটি ‘স্ত্রী লিঙ্গের একজন ‘সে’ নয় এবং এইরূপে স্ত্রী হতে পারে না I একজন ‘সে’ হিসাবে বংশধর একটি ‘তারা’ নয়, যা এটি সম্ভবতঃ হতে পারত, হয়ত লোকাদের এক গোষ্ঠী, বা এক প্রজাতি, বা একটি দল, বা একটি জাতি I বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্ন উপায়ে লোকেরা ভেবেছে যে একটি ‘তারা’ হবে উত্তর I কিন্তু বংশধরটি, একটি ‘সে’ হলে লোকেদের কোনো গোষ্ঠী নয় তা একটি জাতি কিম্বা একটি নির্দিষ্ট ধর্ম যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, মুসলমান, বা এমনকি একটি জাতকে বোঝায় কি না I একটি ‘সে’ হিসাবে বংশধরটি একটি ‘ইহা’ নয় (বংশধরটি একজন ব্যক্তি) I এটি সম্ভাবনাকে বাদ দেয় যে বংশধরটি একটি নির্দিষ্ট, শিক্ষা, প্রযুক্তিবিদ্যা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অথবা ধর্ম I এই ধরণগুলোর মধ্যে একটি ‘ইহা’ সম্ভবত হয়ে থাকবে, এবং এখনও আমাদের পচ্ছন্দের চয়ন হ’ল পৃথিবীকে ঠিক করা I আমরা ভাবি যে যা আমাদের পরিস্থিতিকে ঠিক করবে তা এক প্রকারের ‘ইহা’, তাই মানবীয় চিন্তাশীল ব্যক্তিদের মধ্যে সব থেকে উত্তমরা শতাব্দীব্যাপী বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা, প্রযুক্তিবিদ্যা, ধর্ম ইত্যাদির জন্য বিতর্ক করে এসেছেন I কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি এক সম্পূর্ণ ভিন্ন দিশাকে নির্দেশ করে I ঈশ্বরের মনে অন্য কিছু ছিল – একজন ‘সে’ I এবং এই ‘সে’ সর্পের মস্তক চূর্ণ করবে I            

এছাড়া. যা বলা হয় না তা লক্ষ্য করা চিত্তাকর্ষক I ঈশ্বর একজন বংশধর মানুষকে প্রতিশ্রুতি দেন যেমন তিনি স্ত্রীটিকে প্রতিশ্রুতি দেন I এটি একেবারে অসাধারণ বিশেষত বাইবেল এবং প্রাচীন জগৎব্যাপী পিতাদের মাধ্যমে পুত্রদের আসার উপরে জোর দেওয়া হয়েছে I কিন্তু এ ক্ষেত্রে একজন বংশধরের (এক ‘সে’) কোনো প্রতিশ্রুতি নেই I এটি বলে যে কোনো পুরুষের উল্লেখ ছাড়াই, কেবলমাত্র স্ত্রীটির থেকে একজন বংশধর আসছে I

এখনও অবধি অবস্থিত সমস্ত মানব জাতি, ঐতিহাসিকভাবে অথবা পৌরাণিকভাবে, কেবলমাত্র একজন মায়ের অস্তিত্বের দাবি করেছিল কিন্তু সেই একই সময়ে কখনও একজন শারীরিক পিতার অস্তিত্ব ছিল না I ইনি যীশু ছিলেন (যেশু সৎসংগ) যাকে নতুন নিয়ম (এই প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সহস্রাধিক বছর পরে লেখা) কুমারী মায়ের থেকে জন্ম নেওয়ার কথা ঘোষণা করে – এইরূপে একজন মা কোনো মানবীয় পিতা নয় I সময়ের শুরুতে এখানে কি এই হেঁয়ালির মধ্যে যীশুর সম্বন্ধে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে? এটি পর্যবেক্ষণের সঙ্গে খাপ খায় যে বংশধর একজন ‘সে’, একজন স্ত্রী লিঙ্গের ‘সে’ ‘তারা’ বা ‘ইহা’ নয়, I সেই পরিপ্রেক্ষিতের সাহায্যে, ধাঁধার কিছু টুকরোর সমাধান হয় I     

 ‘তার পাদমূল চূর্ণ করে’ ??

এর মানে কি যে শয়তান/সর্প ‘তার পাদমূল’ চূর্ণ করবে? আমি বুঝতে পারিনি যতক্ষণ না পর্যন্ত আমি আফ্রিকার জঙ্গলে কাজ করলাম I আমাদেরকে এমনকি আর্দ্র গরমের মধ্যেও মোটা রাবারের জুতো পরতে হত – কারণ সাপেরা সেখানে লম্বা ঘাসের মধ্যে শুয়ে থাকত এবং আপনার পায়ে আঘাত করত – অর্থাৎ আপনার পাদমূল – এবং আপনাকে মেরে ফেলত I আমার প্রথম দিন সেখানে আমি প্রায় একটা সাপের উপর পা দিয়ে ফেলেছিলাম, এবং এর থেকে সম্ভবত আমি মারা যেতে পারতাম I তার পরে হেঁয়ালিটি আমার কাছে বোধগম্য হল I ‘সে’ সর্পটির বিনাশ করবে (‘তোমার পাদমূল চূর্ণ করবে’) I সেটি যীশুর বলিদানের মাধ্যমে অর্জিত বিজয়ের আভাস দেয়     

সাপের বংশধর?

কিন্তু তার অন্য শত্রু কে, শয়তানের এই বংশধর? যদিও আমাদের কাছে এখানে স্থান নেই এটিকে বিস্তৃতরূপে সন্ধান করার, পরবর্তী বইগুলো একজন আসন্ন ব্যক্তির সম্বন্ধে কথা বলে I বিবরণটিকে নোট করুন:

আমাদের প্রভু যীশু খ্রীষ্টের আগমন এবং তাঁর কাছে আমাদের সংগৃহীত  হওয়ার বিষয়ে … যে কোনো ভাবে কাউকে আপনাদের প্রতাড়িত করতে দেবেন না, কারণ সেই দিন আসবে না যতক্ষণ পর্যন্ত বিদ্রোহ ঘটে এবং অরাজকতার মানুষটি প্রকাশিত হয়, সেই মানুষটি বিনাশের দণ্ড পায় I সে বিরোধিতা করবে এবং সমস্তকিছুর উপরে নিজেকে উচ্চকৃত করবে যে ঈশ্বর নামে আখ্যাত হয় বা পূজ্য হয়, যাতে সে ঈশ্বরের মন্দিরে নিজেকে স্থাপন করে, নিজেকে ঈশ্বর হতে ঘোষণা করে    

2 থিষলনীকীয় 2:1-4; গ্রীসে প্রায় 50 খ্রীষ্টাব্দে পৌলের দ্বারা লিখিত

এই পরবর্তী বইগুলো স্পষ্টভাবে স্ত্রীটির বংশধর এবং শয়তানের বংশধরের মধ্যে একটি সংঘর্ষের উল্টো গণনার কথা বলে I কিন্তু মানব ইতিহাসের একেবারে শুরুতে, পরিপূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায় বিশদভাবে এটি প্রথমে আদিপুস্তকের এই প্রতিশ্রুতিতে ভ্রুণ-মত রূপের মধ্যে উল্লেখ করা হয় I সুতরাং ইতিহাসের চরম পরিণতি, শয়তান এবং ঈশ্বরের মধ্যে এক চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দীতার উল্টো গণনাকে প্রাচীনতম বইয়ের মধ্যে আগে থেকেই দেখা যায় I   

পূর্বে আমরা প্রাচীন স্তোত্র পুরুসাসুক্তর মধ্য দিয়ে যাত্রা করেছি I আমরা দেখলাম যে এই স্ত্রোতটি এছাড়াও একজন নিখুঁত মানুষের আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করল  – পুরুসা  – একজন মানুষ যিনি আবারও আসবেন ‘মানবীয় ক্ষমতার দ্বারা নয়’I এই মানুষটিকে আবারও বলিতে সমর্পণ করা হবে I আসলে আমরা দেখলাম যে সময়ের শুরুতে ঈশ্বরের হৃদয় এবং মনের মধ্যে এটি সিদ্ধান্ত এবং নির্ধারিত করা হল I এই বই দুটি কি একই ব্যক্তির সম্বন্ধে কথা বলছে? আমার  যে তারা বলছে I পুরুসাসুক্ত এবং আদিপুস্তকে প্রতিশ্রুতি একই ঘটনাকে স্মরণ করে  –  যখন ঈশ্বর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে তিনি টিই একদিন মানুষ রূপে অবতার গ্রহণ করবেন যাতে ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত মানব জাতির সার্বজনীন প্রয়োজনের জন্য এই মানুষটিকে বলিতে সমর্পণ করতে পারা যায় I কিন্তু ঋক  বেদ এবং বাইবেলের মধ্যে এই প্রতিশ্রুতিটি এই একমাত্র অনুরূপতা নয় I যেহেতু তারা মানব ইতিহাসের প্রাচীনতমটি নথিভুক্ত করে সেইহেতু তারা অন্যান্য ঘটনাগুলোকেও একসাথে নথিভুক্ত করে যেটাকে আমরা পরবর্তী পর্যায়ে দেখি I      

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *